Porjotonlipi

গন্তব্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

সমুদ্র নিয়ে আমি, আমার ভাবনা কেমন যেন নিরস। পাহাড় আর সমুদ্রের দ্বন্দে আমি পাহাড়ের মন্ত্রে আটকা ছিলাম। এদিকে আমার প্রিয় মানুষটার সমুদ্র ভালো লাগতো। একারনে দ্বন্দের অবসান হওয়া প্রয়োজন ছিল। আরেকটি কারন ছিল সমুদ্রের কাছে যাবার। সেটা হলো হুমায়ুন আহমেদ। এই ব্যক্তি আমার কাছে সমুদ্রকে জীবন্ত করে তুলেছে। তাঁর কথাটি ছিল এমন, “প্রাণের প্রথম সৃষ্টিই হয় সমুদ্রে। কাজেই বলা যেতে; পারে আমরা উঠে এসেছি সমুদ্র থেকে। সমুদ্র হচ্ছে আমাদের আদি মাতা। আমাদের চোখের জল নোনতা, আমাদের রক্তে যে ঘনত্ত্ব সমুদ্রের পানিরও সেই একই ঘনত্ব। সমুদ্রের প্রতি আমরা এক ধরনের আকর্ষণ তো অনুভব করবই। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ সেই আকর্ষণ তীব্র ভাবে অনুভব করে।”

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে আমার ভাবনা

বেশ কয়েকদিন কোথায় যাব তা নিয়ে ডিসেম্বর ২০২০ থেকে জানুয়ারী ২০২১ প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম। শেষ দিকে ঠিক হলো সমুদ্র দেখব। আমি পূর্বে সমুদ্র দেখেছি বলতে কক্সবাজার, তাও ২০০৬ সালে সৈকতে হাফ প্যান্ট পরে নোনতা পানির ঝাপঝাপি। ব্যাস ঐ পর্যন্তই। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ওরফে দারুচিনি দ্বীপ ওরফে নারিকেল জিঞ্জিরা দেখা হয় নি। তাই ঠিক করা হয় সেখানেই যাওয়া হোক৷ জানুয়ারীর ২৮ তারিখ আমরা রওনা দেই। আমি প্রথম এই দ্বীপ দেখবো। তাই অনেক কিছুই আছে যা আমি জানি না, কিন্তু অনেক মানুষ জানে। তাই সেগুলো এই লেখাতে বলে বিরক্ত করতে চাই না। বরং যা একটু ভিন্ন সেই তথ্য দেই। প্রথমে এই দ্বীপ নিয়ে কিছু বলি।

ব্রিটিশ সময়ে এ দ্বীপ ছিল জংগলে পরিপূর্ণ। উনিশ শতকের শেষ দিকে দ্বীপটি কিনে নেয় মোহাম্মদ ইব্রাহীম যে কিনা পরবর্তীতে জঙ্গল সাফ করিয়ে প্রথম বসতি শুরু করেন। সপ্তম শতক থেকে আরব বণিকেরা এ জায়গার নাম দেয় ‘জাজিরা’ বা ‘অপেক্ষার স্থান’। পরবর্তীতে জাজিরা হয়ে যায় জিঞ্জিরা আর প্রচুর নারিকেল থাকায় এর নাম হয় “নারিকেল জিঞ্জিরা”। ব্রিটিশ আমলে নৌবাহিনী জরিপে এসে এর নাম দেয় “সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড”। আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে ছেঁড়া দ্বীপ এর আগের নাম ছিল ছেঁড়া দিয়া।

যেভাবে গিয়েছিলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

এবার ফেরত আসি আমাদের ভ্রমন গল্পে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে টিকেট কাটা যায় টেকনাফ এর। শ্যামলী, হানিফ, সেইন্ট মার্টিন্স, রিলেক্স, গ্রীন সেইন্ট মার্টিন্স মোটামুটি এই পরিবহনগুলো টেকনাফ যায় যেখানে যাওয়ার ভাড়া পড়বে ৯০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে এসি নন এসি মিলিয়ে। জার্নিটা বেশ বড় তাই কিছু খাবার নিয়ে নিলে বেশ ভালো। তাছাড়া কুমিল্লা সহ কয়েকটি স্থানে বাস বিরতি নেয়।

সন্ধ্যা ৭.৩০ থেকে ৮.৩০ টা পর্যন্ত বাসগুলোর মধ্যে আমরা রাত ৮.৩০ টার বাসেই রওনা দেই এবং ২৮ তারিখ বৃহস্পতিবার থাকায় বাস কিছুটা দেরিতে ছাড়ে মারাত্মক জ্যামের কারনে। ভোর ৬.৩০ টার দিক যখন বাসের জানলা দিয়ে আলো চোখে পড়ে তখন আমরা টেকনাফ। আমাদের জাহাজের টিকেট আগেই কাটা ছিল বলে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না। যে জাহাজ যেগুলো দ্বীপে নিয়ে যাবে তার মধ্যে আছে বে ক্রুজ, পারিজাত, শহীদ সালাম, গ্রীন লাইন ইত্যাদি যেগুলোর সিট ভাড়া ৯০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে সুবিধাভেদে। প্রায় তিনঘণ্টার এই জাহাজ ভ্রমন কম না। তাই ভালো জাহাজ নির্বাচন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। টেকনাফে নেমে আমরা বরং নাশতা করতে মরিয়া ছিলাম।

বেশি ক্ষুধার কারনে আমার এক বন্ধু হোটেলে খিচুরি অর্ডার করে যা ছিল জীবনের অন্যতম চরম ভুল। খিচুরি বলতে চাল সিদ্ধের সাথে হলুদ মরিচ। এ কারনে টেকনাফ জেটীঘাটে পরটা আর ডিম এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর আমরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পৌছালাম।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এর খাবার পর্ব

রিসোর্টে পৌছে কোন মতে ব্যাগ বস্তা রেখে আমরা খেতে গেলাম হোটেলে। হোটেলগুলোর সামনে সুন্দরী, কোরাল, রূপচাঁদা, কালা চান্দা, আইড়, স্যালমন, লাক্ষা ইত্যাদিসহ আরো মাছ ছিল যা আমি তার আগ পর্যন্ত চোখে দেখি নি। এগুলোর দাম ১৫০ থেকে ৬৬০ টাকা পর্যন্ত পেয়েছি। আমি মাছ খাই না তেমন, কিন্তু কড়কড়া ভাজা সামুদ্রিক মাছ অসাধারন। ভাত ৩০ টাকায় আনলিমিটেড, ডাল সবজি ৪০ টাকা । দামাদামি করে নেয়া উচিত। আরেকটা বিষয় হল, দুপুর ৩ টার পর খাবার এর দাম কম থাকে বেশ।

সমুদ্র স্নান ও ঘুরাঘুরি

খাবার পর্ব সেরে নিয়ে রিসোর্টে ফেরত এসে কাপড় নিয়ে সবাই নীল সাগরে ডুব। এসময়টায় ভাটা পড়ে তাই অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। যদিও বেশিদূর পর্যন্ত যাওয়া ঠিক না। সাগরে নামতে গেলে স্যান্ডেল পড়ে নেয়া ভালো  আর নাইলে কোরাল পাথর এড়িয়ে চলতে হবে। আমার নিজেরও পা কেটে গিয়েছিল। একটা বিষয় হল সৈকতের সাথে রিসোর্ট নেয়া ভালো। তাতে যাতায়াত করতে সুবিধা পাওয়া যায়। আমাদের রিসোর্টের নাম ছিল নিঝুম বাড়ি। নিঝুম বাড়ি বেশ ছিমছাম। প্রায় সব ধরনের সুবিধা সহ আমাদের এই রিসোর্টের ব্যবস্থা করে দেন মোঃ হেলাল উদ্দিন সাগর। হেলাল ভাই অসাধারন নায়ক ধরনের আর নরম মনের মানুষ। এখন টুকটাক বিনোদনের হিসাব। সৈকতে শোয়ার বেড পাওয়া যায় যার ভাড়া ঘণ্টা ৪০ টাকা, সাইকেল ঘণ্টা ৪০ টাকা, ডাব ৬০-১০০ টাকা পর্যন্ত, শামুক ঝিনুকের মালা ১০-২০ টাকা। দ্বীপের চারপাশ এ ঘুরে ফেরা যায়। একপাশে কেয়া বন, কোথাও নারিকেল এর গাছ, পাম গাছ ও দেখাছিলাম।

সূর্যাস্ত দর্শন

দ্বীপের চেহারা বদলাতে থেকে সন্ধ্যার আগ থেকে। সূর্য যখন ডুব দিতে যাবে তখন আমাকে এক কাপ চা নিয়ে বসতে হয়েছিল হুমায়ুন স্যার এর বাসার সামনে। এই জায়গাটা থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায় ভালো। আমি তখন আমার চিরচেনা জগত থেকে বিচ্ছিন্ন। সমুদ্রের বাতাসে শীত মাখা, আমি দেখছি সূর্য ডুবে যাচ্ছে আর সাগর এর ঢেউ সেকন্ডে সেকেন্ডে কাছে চলে আসছে। মূহুর্তেই রঙ চেহারা আবার বদলে গেলো সমুদ্রের। রুক্ষ, হিংস্র হওয়া শুরু করলো সমুদ্র।

এ সমুদ্রকে আমি তখন চিনি না। সৈকতে আছড়ে  ঢেউগুলো আমাকে উপেক্ষা করে চলেছে। আমিও হা করে তাকিয়ে তাকিয়ে তার বদলে যাওয়া রূপ দেখছি। আমি জানতাম না যে আমার আরো অবাক হওয়া বাকি ছিল, বাকি ছিল অভিভূত হওয়া। যখন অন্ধকার নেমে আসবে তার রুপ দেখা আমার তখনও বাকি। চারপাশ অন্ধকার। কেয়া বনের পাশে বসে থাকা আমরা তখন কালো সমুদ্র দেখছি। তাতে বেঁধে রাখা দুলতে থাকা নৌকা গুলো দেখছি, একটা বিশাল চাঁদ আর তার প্রতিফলনে মানুষের হেটে যাওয়া দেখছি, দেখছি দূরের জাহাজের জ্বলতে থাকা আলো, দেখছি প্রচন্ড শীতল বাতাসে আমরা এই ভীন জগতে হারিয়ে যাওয়াকে। আমি বুঝতে পারলাম সমুদ্র আমাকে আমারই জীবনে ঘটে যাওয়া গল্পগুলো শোনায়।

আমাকে বিশালতা শেখাবে, স্রষ্টার সৃষ্টির কাছে আমি কতটা ক্ষুদ্র কিংবা আমি এই অনুভূতি পাচ্ছি বলে আমি বেঁচে আছি সেটাই শেখাবে। আমি বুঝলাম শুধু পূর্নিমা নয় বরং অমাবস্যায় ও এ সমুদ্র ভয়ঙ্গকর সুন্দর। এই দ্বীপের ভয়ংকর সুন্দর দেখার জন্য আমি মুখিয়ে থাকি তখন। আমি কৃতজ্ঞ স্রষ্টার কাছে, স্রষ্টার এই অপূর্ব সৃষ্টির কাছে। আমরা সমুদ্র দেখে নির্বাক হয়ে বসে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। আমি তখনো জানতাম না সমুদ্রের হিপ্নোটাইজিং ফ্যাক্ট কাজ করে চলেছে।

দারুচিনি দ্বীপের ভোরের গল্পটা বলব না। ভোরের গল্পটা ভিন্ন। আমি যখন কাঠখোট্টা এই শহরের মাঝে বসে লিখছি তখন বুঝতে পারছি আমি এই দ্বীপের মায়ায় পড়ে গিয়েছি। ঘুমের মাঝে স্বপ্নের কিছুটা রেশ থেকে যাক বরং।

কিছু দিক নির্দেশনা

ছুটির দিন হোক বা না হোক কাপড় অল্প নিয়ে যাওয়া ভাল । কারন বলছি, জাহাজ থেকে জাহাজের ভেতর হয়ে জেটীতে নামতে হয়। একারনে মানুষ ঠেলে বড় ব্যাগ টেনে নেয়া ভয়ংকর ব্যপার। আর রিসোর্টে কাপড় শুকানোর ব্যবস্থা থাকে।  জাহাজে থাকা কালীন হাল্কা সি সিকনেস হওয়া স্বাভাবিক। আমি হেডফোন দিয়ে গান শুনছিলাম যেকারনে অনেকটা কমে গিয়েছিল। জাহাজ থেকে বের হয়ে আমি প্রথম যা দেখলাম সেটা হলো নীল। আকাশ নীল, সমুদ্র  নীল । হাল্কা নীল , গাড় নীল, সবুজে নীল, সাদাটে নীল আর বড় বড় নৌকা । এসবের মধ্যে নিজেকে ভীনগ্রহের প্রাণী মনে হইয় কেন জানি। যেন সাগরের পানি ,আকাশ, মাটি চোখ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আমাদের রিসোর্ট আগেই বুকিং করা ছিল। বুকিং করে যাওয়া ভালো হয় কারন আমরা সেদিন রিসোর্ট এ যেতে যেতে অনেকের কাছেই শুনেছিলাম তারা বীচে রাত কাটিয়েছে। ওদিকে রুম ভাড়া প্রায় ৮ হাজার পর্যন্ত উঠেছে। স্রষ্টার কাছে হাজার শুকরিয়া এমন বিপদে পড়িনি। রিসোর্টগুলোতে যেতে হবে বাজারের মধ্যে দিয়ে। যাওয়ার সময়েই রিক্সা ভাড়ার একটা তালিকা চোখে পড়বে। ছবি তুলে নেয়া ভাল। সবশেষে মনে রাখবেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কর্মকান্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন।

কন্টেন্ট রাইটারঃ আসিফ হাসান

Porjotonlipi

2 comments

    • ভ্রমণ করুন দেশকে চিনুন! আর অবশ্যই পর্যটনলিপির সাথে থাকুন, ধন্যবাদ।