Porjotonlipi

শিবপুরের চিনাদী বিল – চলছে পদ্মখেলা

বলছি নরসিংদী জেলার শিবপুরের চিনাদী বিল এর কথা। নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে দুলালপুর ইউনিয়নে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি বিলের নাম চিনাদী বিল।

পদ্মরাজ্য শিবপুরের চিনাদী বিল

মানিকদী, শিমুলিয়া, দুলালপুর, ভিটি চিনাদী ও দরগাহবন্দ এই পাঁচ গ্রামের মিলনস্থলে অবস্থিত এই বিলটির যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক রূপ, তেমনি বিলের পানিতে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির সু-স্বাদু মৎস্য সম্পদের ছড়াছড়ি। এই বিলের সুস্বাদু মাছের স্বাদের খ্যাতি রয়েছে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত। আর নদী তীরে রয়েছে কৃষকদের আবাদ করা নানা রকম শাকসবজির ক্ষেত।

পদ্মের রাজ্যে বিচরণ

চারদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় দৃষ্টিসীমার মাঝে শুধুই পদ্ম ফুল। বিলজুড়ে ঢেউয়ের তালে তালে মাথা উঁচু করে ভাসছে সাদা-গোলাপি পাঁপড়ির মিশেলে শত শত পদ্মফুল। বিলজুড়ে পদ্মফুলের এমন অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়তই ছুটে আসে হাজারো সৌন্দর্য পিপাসুর দল। এদের মাঝে কেউ বিল পাড়ের গাছ তলায় বসে উপভোগ করে বিলের নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য। আবার কেউবা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেরায় বিলের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বর্ষায় এ বিল যেন নববধূর সাজে সেজে ওঠে। এসময় বিলের বুক জুড়ে প্রস্ফুটিত হয় শত শত পদ্মফুল। স্বচ্ছ জলরাশিতে ভেসে থাকা পদ্মফুলে কানায় কানায় ভরে থাকা এই বিলের সৌন্দর্যকে আরো নৈসর্গিক করে তোলে বিলজুড়ে চিল, মাছরাঙা, পান কৌড়ি, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন পাখির অবাধ বিচরণ। পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শীতকালীন সৌন্দর্য

শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠে এই বিল। জেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা কচুরিপানায় বসে মাছ শিকারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। দলবেধে এসব পাখিদের ওড়াওড়ি নিমিষেই কেড়ে নেয় দর্শনার্থীদের মন। শীতকালীন এসব পাখির সৌন্দর্য্য দেখার জন্য ভীড় করে স্থানীয় মানুষসহ দূরদূরান্তের পর্যটকরা। ঈদ কিংবা অন্যসব উৎসবেও নামে মানুষের ঢল। যান্ত্রিক কোলাহলমুক্ত এই দৃশ্যপটে পাখিসহ বিভিন্ন জীব বৈচিত্রের কারনে রক্ষা হচ্ছে পরিবেশ এর ভারসাম্যও। বিলের চারপাশের শস্য-শ্যামলা নয়নাভিরাম দৃশ্য ও নীল আকাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য দৃষ্টি কাড়ে বিলে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের। নৌকায় করে বিলের বুকজুড়ে ভেসে বেড়ানো অথবা বিলের তীরে পায়ে হেটে চিনাদী বিলের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয় তারা।

সান্ধ্যকালীন মুগ্ধতা

সন্ধ্যা নামার আগ মুহুর্তে আকাশের রংধনু চিনাদী বিলের পানির সাথে মিশে গড়ে তোলে এক অদ্ভুত মিতালী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চিনাদী বিল প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে পর্যটকদের। তাইতো প্রতিদিনই সকল বয়সী মানুষের ভীড়ে মুখর হয়ে উঠে চিনাদী বিলের পাড়।

সৌন্দর্য পিপাসুদের মিলনমেলা

প্রায় ৫ শত ৫০ বিঘা আয়তনের স্বচ্ছ পানির এই বিলজুড়ে রয়েছে বক, চিল, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বালিহাঁস ইত্যাদি পাখির বিচরণ ক্ষেত্রসহ প্রাকৃতিক দৃশ্য ও নীল আকাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য। নয়নাভিরাম এই দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতি বছরই  নরসিংদী জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী। বিলের স্বচ্ছ পানি, পদ্মফুল ও প্রকৃতির সাথে আকাশের মিতালী উপভোগ করতে ছুটির দিন কিংবা যেকোনো অবসরে পরিবার পরিজন অথবা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও।

উৎপত্তি ও নামকরণের ইতিহাস

বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী-নালা, খাল-বিল কখন সৃষ্টি হয়েছে, এমনতর বিবরণ যেমন অজানা, ঠিক তেমনি চিনাদী বিলটির উৎপত্তিও কখন হয়েছে কেউ বলতে পারেনা। যতোটুকু জানা যায়, ময়মনসিংহের জমিদার এককালে ক্রয়সূত্রে বিলের মালিক ছিলেন। জমিদারের নাম ছিলো আয়েশা আক্তার। তিনি তাঁর বিলের পূর্বপাড়ে সাধারণ মানুষের গোসলের জন্য একটি ঘাট বাঁধাই করে দিয়েছিলেন, যা আয়শার ঘাট নামে পরিচিত ছিলো। বর্তমানেও ঘাটটি রয়েছে, তবে নাম চিনাদীঘাট। জমিদার আয়েশা আক্তারের নিকট থেকে চিনাদী গ্রামের ৩০ জন জেলে পরবর্তীতে বিলটি কিনে নিতে সমর্থ হন। তখনকার দিনে বিক্রয়মূল্য ছিলো ৫০০ (পাঁচশত) টাকা। জলাশয়ের সর্বমোট আয়তন ১৮৩ একর ৮০ শতাংশ। সেই সময় গ্রামের অধিবাসী জেলে সম্প্রদায় তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বিলটি কিনেছিলেন। সম্ভবত, ১৮৬৫ সালে জমিদার আয়েশা আক্তার বিল বিক্রি করে স্বত্বহীন হন।

চিনাদী বিল থেকে স্বপ্নচিনাদী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই পদ্মবিলকে স্থানীয়ভাবে চিনাদী বিল নামে ডাকা হয়। তবে ২০১৬ সালে নরসিংদীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবু হেনা মোরশেদ জামান বিলটির নাম দেন ‘স্বপ্নচিনাদী’। 

বর্তমান অবস্থা

ক্রমান্বয়ে জেলে পরিবার বৃদ্ধি পেলে ৭৬ জনের নামে বিলের রেকর্ড হয়, যদিও বর্তমানে প্রায় ১৫০ টি পরিবার চিনাদী বিল থেকে মৎস্য আহরণ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। এ বিলের মাছ অনেক সুস্বাদু এবং দামেও একটু বেশি। নানা প্রজাতির মাছের মধ্যে কাচকি ও চাপিলার স্বাদ আলাদা। দূর-দূরান্তের মানুষ পার্শ্ববর্তী দুলালপুর, দুলালপুরের মোড়, দত্তের গাঁও এবং গড়বাড়ী বাজার থেকে চিনাদী বিলের মাছ শখ করে কিনে নিয়ে যায়। আবার কখনো কোনো জেলে/বিক্রেতা চিনাদীর মাছ নিয়ে গ্রামান্তরে ফেরি করলে তার কদর অনেক বেড়ে যায়।

বিল ও বিলপাড়ের বাসিন্দাদের আত্নিক সম্পর্ক

বিলের পূর্বপাড়ের গ্রামে বসবাসকারী জেলেদের একমাত্র অবলম্বন বিলটি। বিলটি তাদের জান, প্রাণ এবং জীবন। বিলকে ঘিরেই তাদের সকল আশা-ভরসা এবং স্বপ্ন। বিলের পাড়ে বসে তারা অবসর সময় কাটায়, গল্প করে, হাসে, কাঁদে অথবা আনন্দ করে। আবার, তাদের ভবের খেলা সাঙ্গ হলে বিলের ধারের শ্মশানেই দাহ্য হয়ে ভস্মে পরিণত হয়।

প্রচলিত উপকথা ও ভৌতিক কল্পকাহিনীঃ

চিনাদী বিল নিয়ে অনেক উপকথাও রয়েছে। জানা যায় যে, বিলের পূর্ব কোণে একটি চড়ক গাছ ছিলো। এ গাছের নিচে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির তালিকা রেখে দিলে তা পাওয়া যেতো। প্রয়োজন শেষ হলে আবার সেসব গাছের নিচে রেখে আসতে হতো। আর এভাবেই চলছিলো জনহিতকর কাজ। কোনো এক সময় দুষ্ট প্রকৃতির কেউ কোনো একটি জিনিস রেখে দিলে বা বিনষ্ট করলে অলৌকিকভাবে দ্রব্যাদির আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শোনা যায়, চড়ক গাছটির উপরের অংশ একজন লোক কেটে নিয়েছিলো। এ কাজ করার কারণে লোকটি নির্বংশ হয়েছিলো। অতি পুরাতন চড়ক গাছের অর্ধাংশ এখনো রয়েছে, যেটির বয়স অনেক বেশি হলেও তা মরে বা শুকিয়ে যাচ্ছে না। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো তা দাঁড়িয়ে আছে। এলাকায় কথিত আছে, এ বিলে একসময় দেওয়ান মান্নান খানের স্বর্ণের কোষা নৌকা ও পবনের বৈঠা ছিলো। আশ্চর্যজনক হলো যে, সেই কোষা ও বৈঠা শুধু মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হতো। কোনো একদিন অসুর জাতীয় লোকেরা কোষাটি বেয়ে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিলো। যাওয়ার সময় সমস্ত পথ খাল হয়ে মেঘনা নদীতে পতিত হতে হতে একসময় তা অদৃশ্য হয়। দেওয়ান মান্নান খানের নাম অনুসারে খালের নাম হয়ে যায় দেওয়ান খাল বা দেওয়ানখালী। খালের চিহ্ন এখনো বর্তমান এবং খালটি বহমান। এছাড়া অনেকে মনে করতো, বিলে ভূত-পেত্নি-প্রেতাত্মা রয়েছে, যাদের দ্বারা অনেক অঘটনও ঘটেছে। তবে বিলপাড়ের মানুষেরা এগুলোকে তেমন পাত্তা দেয় না।

কিভাবে যাবেন শিবপুরের চিনাদী বিল

সড়কপথে রাজধানী ঢাকা থেকে নরসিংদীর দূরত্ব ৫৭ কি.মি.। এই বিলে পৌঁছাতে হলে আপনাকে নামতে হবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানার মোড় অথবা ইটাখোলা মোড়ে। সেখান থেকে সিএনজি কিংবা অটোরিকশাতে করে পৌঁছাতে হবে কাঙ্খিত গন্তব্যে। বিলে ঘুরাঘুরির জন্য ঘাটে পাবেন নৌকা, সেক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় আপনাকে গুণতে হবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাহিম সাদেক সৌরভ

-করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সকল ভ্রমণ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। এই মহামারীর সময়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন, নিরাপদে থাকুন।  

Porjotonlipi

Add comment