Porjotonlipi

ভারতবর্ষ ভ্রমণে, ইতিহাসের সন্ধানে (পর্ব ৪)

আজ আমরা ফতেহপুর সিকরি এর ভ্রমণ শেষ করে আমাদের আরেক ইতিহাসের রাজ্য গোলাপি শহর জয়পুর এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল বেলা আমাদের জয়পুর রাজ্যে প্রবেশ। আমরা যে সময়ে ভারত ভ্রমনে ছিলাম, সে সময়ে পুরো ভারত জুড়ে চলছে কুরবানি ঈদের প্রস্তুতি। বিভিন্ন জায়গায় দেখা মিলছে ছাগল বিক্রেতাদের।

গোলাপি শহর জয়পুর

জয়পুরের সড়কগুলোতেও একই চিত্র। টেলিভিশনের পর্দায় আমরা অনেক রাজস্থানি মানুষের উপস্থিতি দেখেছি, রঙিন শাড়ী, সাদা কুর্তা, সাদা ধুতি, মাথায় চুনরি কাপড়ের বিশেষ পাগড়ি – গাড়িতে বসে ঠিক এই দৃশ্যগুলোই উপভোগ করছিলাম।

পুরনো ইতিহাসকে নতুন করে জানা

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুর। একসময়ে রাজাদের রাজকীয় বিচরণ ছিল যেটা এখন তেমন প্রভাবশালী নয়। ১৭২৭ সালে নির্মিত এই শহর একনামে সবাই গোলাপি দালানের শহর বা পিংক সিটির শহর নামেই চিনে। এই জয়পুর ভারতীয় সংস্কৃতি আর সমসাময়িক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে জীবন্ত একটি রঙিন শহর। ১৭২৭ সালে রাজা ২য় জয় সিং এর হাত ধরে এই রাজ্যের সূচনা হয়। রাজ্যের শেষ রাজা ছিলেন ভবানী সিং – অপুত্রক হওয়ার কারণে তিনি তাঁর মেয়ের ঘরের নাতিকে রাজ্যের রাজা ঘোষণা করেন যার নাম পদ্মনাভ সিং – ২২ বর্ষীয় সুদর্শন রাজা, সফলতার সাথে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্তে নিয়োজিত আছেন।

গোলাপি দালানের উপস্থিতি যেখানে

দেখতে দেখতে চলে আসলাম জয়পুরের পরিচিতি “গোলাপি শহরে” মানে পিংক সিটি তে। খুবই ছোট একটি এলাকা, কিন্তু এলাকার ছোট বড় সবগুলো দালান গোলাপি টেরাকোটা রঙের। এই গোলাপি শহর শুধু গোলাপি দালানের জন্যই নয়, বরং ভারতের সবচেয়ে রঙিন শহর হিসেবে পরিচিত। জয়পুর শহর নির্মাণকালে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে পুরো শহর গোলাপি রঙের হবে – কারণ গোলাপি রঙ আতিথেয়তাকে ইঙ্গিত করে। আর আমরা সবাই জানি এশিয় মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবং ভারত অনেক অতিথিপরায়ন দেশ। ভারতে অতিথিদের ভগবানের সাথে তুলনা করা হয়। গোলাপি রঙ মহারাজা সাওয়াই রাম সিং এর প্রিয় রঙ ছিল, এবং তিনি পুরো এলাকা গোলাপি রঙে রাঙানর নির্দেশ দেন এবং নতুন আইন প্রণয়ন করেন যে অন্য রঙের ব্যাবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

জলে নির্মিত জল মহল

নামের মধ্যেই একটা ঠাণ্ডা, সতেজ অনুভূতি পাওয়া যায়। মহলের উদ্দেশ্যও এটাই ছিল। সেকালে বিদ্যুতের আবিষ্কার না হওয়ার কারণে গরমকালের জন্য নির্মাণ করা হত আলাদা মহল বা বিশেষ ছাদ সম্বলিত দালান। রাজা মান সিং এর প্রাসাদ থেকে খানিকটা দূরে নির্মাণ করা হয়েছে এই মহল। মহলের নির্মাণশৈলীতে রাজপুত এবং মুঘল স্থাপত্যের ছোঁয়া দেখা যায়। মান সাগর হ্রদের মধ্যখানে এই মহলের অবস্থান, গরমকালের তাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রাজকীয় সদস্যরা এই মহলেই ঠাই নিতেন। বর্ষাকালের ভারী বর্ষণে এই জলের মহল এক অন্যরকম সতেজ রূপ ধারণ করে।

নাহারগড় কেল্লা

জলমহল থেকে খানিকটা দূরে এই কেল্লার অবস্থান। কেল্লাতে রাজা মাধবেন্দ্র ভাওয়ানের ১২জন রানীর জন্য একই রকম দেখতে ১২টি কক্ষ ছিল। কেল্লাটি এমনভাবে বানানো হয়েছিল যাতে মহারাজা কোন এক রানীর কক্ষে প্রবেশ করলে অন্যকেও যাতে টের না পায়।এই নাহারগড় কেল্লা তে ভারতীও এবং ইউরোপিয়ান স্থাপত্যশিল্পের অনুপম সংমিশ্রণ রয়েছে। এই কেল্লার ছাদে রয়েছে একটি রেস্তোরাঁ যেখান থেকে কেল্লার পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

বিচিত্র কাহিনীর হাওয়া মহল

মোঘল স্থাপত্যশিল্পের দৃশ্যগুলো খুবই মনোরম। এত বিশাল আর এত জায়গা নিয়ে স্থাপত্য গুলো বানানো হয়, আর এত কৌশলপূর্ণ, যেগুলো দেখলে রাজাদের শাসনকাজের পাশাপাশি বিচারবুদ্ধির ও আলাদা কদর করতে হয়। রাজপুত এবং মোঘল স্থাপত্যশিল্পের নিখুঁত স্থাপনা এই হাওয়া মহল। রানীরা যাতে ভারতীয় উৎসব এবং পার্বণগুলোকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পাড়ে, সেকারণে মহারাজা সাওয়াই প্রতাপ সিং ১৭৯৯ সালে লাল এবং গোলাপি বেলেপাথরের সংমিশ্রণে পঞ্চতলা বিশিষ্ট এই মহলের নির্মাণ করিয়ে থাকেন। স্থাপনার আকারে শ্রীকৃষ্ণের মাথার মুকুটের মিল পাওয়া যায় এবং মহলের গায়ে রয়েছে ৯৫৩টি ঝারখা বা জানালা। জানালাগুলো এমনভাবে বানানো যার ভিতর দিয়ে মানুষের নজর থেকে আড়ালে দাঁড়িয়ে  রানীরা সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া উৎসব-পার্বণের চিত্র দেখতে পারে। পিংক সিটির পাশাপাশি এই হাওয়া মহল জয়পুরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

রঙিন সংগ্রহালয় আলবার্ট হল

মহারাজা সওয়াই রাম সিং এর শাসনামলে রানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্ট তাঁর ১৮৭৬ সালের ভারত সফরে জয়পুর বেড়াতে আসেন এবং মহারাজা প্রিন্স আলবার্ট কে খুশি করার জন্য বেশ বড় পরিকল্পনা হাতে নেন এবং এই বিশাল মিলনায়তনের নির্মাণ করান প্রিন্স আলবার্ট এর নামানুসারে হলের নামকরণ করেন প্রিন্স আলবার্ট হল মিউসিয়াম। পরবর্তীতে তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুরো এলাকাকে তিনি টেরাকোটা গোলাপি রঙ দিবেন যে রঙ সকল আবহাওয়াতেই টেকসই। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের মত এই আলবার্ট হলেরও আসল সৌন্দর্য সন্ধ্যা হলে দেখতে পাওয়া যায়। পুরো হলকে সাজানো হয় রঙিন বাতি দিয়ে, যেগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পর রঙ বদলায়, এবং একেক রঙে আলবার্ট হল ধারণ করে একেক রূপ।

বলিউডে রাজস্থান

হিন্দি সিনেমা আমাদের সকলের কাছেই অনেক প্রিয়। বিভিন্ন ধরনের গল্পের পাশাপাশি সিনেমার পরিচালকরা ভারতের বিভিন্ন পর্যটন স্থানগুলোকে অনেক সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলেন। ফুটিয়ে তোলেন সেখানকার সংস্কৃতি, পোশাকআশাক, খাবার এবং আরও পারিপার্শ্বিক ব্যাপার। কালের পরিক্রমায় রাজস্থান উঠে এসেছে বলিউডের অনেক সিনেমাতেই। কিন্তু ২০০৫ সালে শাহরুখ খান অভিনীত পাহেলি  সিনেমাটি যেন একটু বেশিই জনপ্রিয়। কারণ সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে সেখানকার সংস্কৃতি, উচ্চারিত ভাষা, ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ, আর দর্শনীয় স্থানের কথা তো বলাই বাহুল্য।

বিদেশি পর্যটকরা ভারত ভ্রমনে জয়পুরকে তালিকার উপরে রাখে, কারণ জয়পুর শহর টাই দুর্গ, জাদুঘর, খাবার, স্মৃতিসৌধ, গহনা আর চুনরি কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ।

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাতেমা নজরুল স্নেহা

Porjotonlipi

1 comment