Porjotonlipi

ভারতবর্ষ ভ্রমণে, ইতিহাসের সন্ধানে (শেষ পর্ব)

ভারতবর্ষ ভ্রমণ গল্পের শেষ পর্বে আজ বলবো কবিগুরুর শান্তিনিকেতন দর্শনের কথা। ভারতের চলচ্চিত্র শহর মুম্বাই ছেড়ে বিকাল ৪টার ট্রেনে আমাদের কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। ২৮ ঘণ্টার যাত্রা, হাতে অফুরন্ত সময়। আগেও বলেছি দূরপাল্লার যাত্রা হলেও খারাপ লাগবে না একটু সময়ের জন্যও, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতেই অনেকটা সময় কেটে যায়।

শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী দর্শন

যেদিন আমরা কলকাতার জন্য ট্রেনে যাত্রা শুরু করি তার পরের দিন ছিল পবিত্র ঈদ – উল – আযহা। রাত ৮টায় আমাদের কলকাতার হাওড়া স্টেশনে অবতরন।

শান্তিনিকেতন যাত্রা

পরদিন সকাল ৮টার ট্রেনে করে হাওড়া স্টেশন থেকে আমাদের বোলপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। আড়াই ঘণ্টার পথ। ভারতে যাওয়ার পর এটাই ছিল আমাদের প্রথম লোকাল ট্রেন যাত্রা। লোকাল ট্রেন হলেও ভিতরের পরিবেশ ছিল খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দিনটি ছিল বৃষ্টিমুখর। ট্রেনের জানালা দিয়ে সুন্দর ঠাণ্ডা, মিষ্টি বাতাসের আনাগোনা, যার ছোঁয়ায় শরীর ও মন হয়ে যায় শিথিল।

বোলপুর স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের দুরত্বে কবিগুরু রবিন্দ্রনাথের সেই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বিশাল এলাকা জুড়ে সম্পূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশে অতি সাধারন কিন্তু গৌরবমণ্ডিত এক শিক্ষাগার। ভিতরে রয়েছে ছোট ছোট গুটিকয়েক পুরনো দালান, তার সামনেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।

শান্তিনিকেতন এর ইতিহাস কথন

অতি শুরুতে অর্থাৎ ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরের কাছাকাছি অবস্থিত শান্তিনিকেতন  নামক একটি আশ্রমে ব্রহ্মচর্যাশ্রম নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র ছাত্রীদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তবিক এবং ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে আলোকিত করা। কবিগুরু এই উদ্দেশ্য গ্রহণ করেন প্রাচীন ভারতের তপোবন বিদ্যালয়  থেকে। বিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের একজন ছিলেন রবীন্দ্রপুত্র রথীন্দ্রনাথ। এর সতের বছর পরে, ১৯১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন স্বয়ং রবিঠাকুর এবং উদ্বোধন কাজে কবিগুরুকে সর্বাত্মক সাহায্য করেন আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল।

শান্তিনিকেতন ভবন আশ্রমের সবচেয়ে পুরনো ভবন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ভবনের নির্মাণ করিয়েছিলেন। প্রাথমিক অবস্থায় ভবনটি একতলা ছিল যেটিকে পরবর্তীতে দোতলা করা হয়। বাড়ির উপরিভাগে খোদাই করা আছে সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং মহর্ষির প্রিয় উপনিষদের এই উক্তিটি। তিনি নিজে বাড়ির একতলায় ধ্যানে বসতেন। তার অনুগামীরাও এখানে এসে থেকেছেন।

এখন বাড়ির সামনে রামকিঙ্কর বেইজ নির্মিত একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য রয়েছে। শান্তিনিকেতন ভবনের অদূরে একটি টিলার আকারের মাটির ঢিবি আছে। মহর্ষি এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতেন। একসময় এই টিলার নিচে একটি পুকুরও ছিল।

ভবন বিন্যাস

শুরুতে আসে বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট যার নাম শিক্ষা ভবন, যেখানে মূলত বিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন বিষয় যেমন – পদার্থ, রসায়ন, গনিত ইত্যাদি। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে এই ভবনটিকে মানবিক বিষয় পড়ানোর জন্য একটি স্নাতকোত্তর কলেজ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। শিক্ষাগত পরিবর্তনের কারণে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল ভবনের কার্যক্রমে, যার বিস্তারিত উইকিপিডিয়া খুঁজলে পাওয়া যায়। বাইরের সাজসজ্জায় গ্রামীণ ছোঁয়া থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ আধুনিক, এমনকি উচ্চমূল্যের ডিগ্রিও সেখান থেকে প্রদান করা হয়।

আরও আছে বিদ্যা ভবন  যেখানে ভাষা, সাহিত্য, দর্শন এবং হিন্দি উর্দু সহ বিভিন্ন ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করা হয়।

পুরো বিশ্বভারতীতে রয়েছে দুইটি প্রাঙ্গন যার একটি শান্তিনিকেতন এবং অন্যটি শ্রীনিকেতন । শান্তিনিকেতন মূলত ছিল রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মচর্যাশ্রম নির্মাণ করার জন্য ক্রয়ক্রিত জমির নাম, যেটি তিনি কিনেছিলেন তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের  কাছ থেকে আনুমানিক ১৮৬৩ সালে।

কিছু দূরে ছাতিম তলা  নামক একটি জায়গা আছে, যেখানে একটি বিশালাকার ভারী ঘণ্টা বসানো আছে। ঘণ্টাটির অবস্থান এমন জায়গায়, যেখান থেকে ঘণ্টা বাজালে বিশ্বভারতীর যেকোনো জায়গা থেকে শুনতে পাওয়া যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবন চীনা ভবন । বর্তমানে দেশ বিদেশের অনেক ছাত্রছাত্রী চীন দেশে শিক্ষা অর্জনে নিয়োজিত। একসময়ে ভারতের সাথে চীনের বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সম্পর্কে ফাটল ধরলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে এই বিশেষ অনুষদের ব্যবস্থা করেন যাতে আগেয়র সম্পর্কের পুনরুদ্ধার ঘটে। ফলে চীনের অনেক শিক্ষার্থী এখানে লেখাপড়ার সুযোগে আসেন, এবং তাঁদের অনেকেই এখন বেশ স্বনামধন্য ব্যক্তি।

 

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়  ভারতের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রাক্তনীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কারবিজয়ী চিত্র-পরিচালক সত্যজিৎ রায়, জয়পুরের রানী এবং কুচবিহারের রাজকন্যা গায়েত্রী দেবী, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় গায়ক অর্ণব

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাতেমা নজরুল স্নেহা

-করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সকল ভ্রমণ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। এই মহামারীর সময়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন, নিরাপদে থাকুন।  

Porjotonlipi

Add comment