Porjotonlipi
Gateway of India

ভারতবর্ষ ভ্রমণে, ইতিহাসের সন্ধানে (পর্ব ৬)

রাজাস্থানের পবিত্র শহর আজমির থেকে বিকাল ৪.৩০ এর ট্রেনে আমাদের বলিউডের শহর মুম্বাই এর উদ্দেশ্যে যাত্রা।

রূপালী পর্দার শহর মুম্বাই

বেলা ১২টা নাগাদ আমাদের বলিউডের শহর মুম্বাই তে অবতরন, উঠেছিলাম বান্দ্রার এক হোটেলে। মধ্যাহ্নভোজের পরে শুরু হয় আমাদের সফরঘড়ি। শুরুতে জেনে আসি মুম্বাই সম্পর্কে অল্পবিস্তর কিছু ইতিহাস।

 

বলিউডের শহর মুম্বাই এর নামকরণ পর্ব  

মুম্বাই – যাকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বোম্বে নামে ডাকা হত। মুম্বাই শব্দের পিছনে রয়েছে চমকপ্রদ কাহিনী। মুম্বাই  প্রধানত একটি উচ্চারনবিকৃত শব্দ, যার উদ্ভব মারাঠিদের থেকে। বোম্বাই  উচ্চারন মারাঠিরা করতে পারত না যে কারণে তারা মুম্বাই এর প্রচলন শুরু করেন। বোম্বাই  শব্দের আগমন আবার ষোড়শ শতকে পর্তুগীজ শাসনামলে। বোম্বাই শব্দের অর্থ সমুদ্রের ছোট পাড় । পর্তুগীজরা কেন এই বোম্বাই নাম রাখেন, সেটা আমরা একটু পরেই জানতে পারব। মারাঠি এবং গুজরাটিভাষীদের কাছে এই শহর মুম্বাই  এবং হিন্দি, পারসী ও উর্দুভাষীদের নিকট এই শহর বোম্বে  নামে পরিচিত।  

মুম্বাই এর অবস্থান 

ভারতের মহারাষ্ট্র  রাজ্যের রাজধানী এই মুম্বাই, যেটি ভারতের সবচেয়ে বড় শহর এবং ঘনবসতিপূর্ণ। ২০০৯ সালের তথ্য অনুযায়ী মুম্বাই আলফা বিশ্ব নগরী  হিসেবে পরিচিত। ভারতের অন্যতম ব্যাস্ত এই শহর আরব সাগরের পাড়ে অবস্থিত। ছিমছাম, পরিপাটি একটা ভাব এই শহরের সর্বত্র দেখা যায়। এই বোম্বে বাণিজ্যিক শহরও বটে, যে কারণে এই শহরে বেশ কিছু উড়ালসেতু, বহুতল ভবনের দেখা একটু বেশিই মিলে। 

Cityscape of Mumbai

বোম্বের তাজমহলগেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া 

মুম্বাই দর্শনের প্রথম গন্তব্য ছিল গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া। আরব সাগরের পাড়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহি এই তোরণ। বিশ শতকের শুরুতে ১৯১১ সালে এই তোরণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়, যার দায়িত্ব পালন করেন সে সময়ে বোম্বে সফরে আসা রাজা পঞ্চম জর্জ  এবং কুইন ম্যারী । গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া মূলত তাদের অ্যাপোলো ব্যানডার আগমনের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশে নির্মাণ করা হয়। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পাঁচ বছর পর শুরু হয় এর নির্মাণ কাজ যার সমাপ্তি ঘটে ১৯২৪ সালে। একই বছরের ৪ঠা ডিসেম্বর ভাইসরয় দি আর্ল অফ রিডিং এই তোরণ সর্বসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ৮৫ ফুট লম্বা, ব্যাসল্টের তৈরি এই তোরণের নকশা করেন স্কটিশ স্থাপত্যবিদ জর্জ উইত্তেত । ইন্দো- সাবাসেনিক স্থাপত্যশৈলীতে গুজরাট- রোমান বিজয়তোরণের একত্রিত ডিজাইনে নির্মিত এই তোরণের মধ্যে মুসলিম- হিন্দু সজ্জার সম্মিলন ঘটেছে। অর্থাৎ, তোরণের মাঝবরাবর দেখা যায় মসজিদের ন্যায় বিশাল ফাঁকা, এবং উপরে চার কোণায় আছে হিন্দুদের মন্দিরের মত নকশা। শুরুতে এই তোরণ জেলে সম্প্রদায়ের জেটি হিসেবে ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে সংস্কার করে এটিকে বিশেষ ব্যাক্তিবর্গের অবতরণের জন্য বিশেষ বন্দরে পরিণত করা হয়। এই তোরণটি নির্মাণে ব্যায় করা হয়েছিল সে সময়ের ২.১ মিলিয়ন রুপি, যার পুরোটাই ভারত সরকারের অবদান।  

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’র ঠিক বিপরীতেই অবস্থিত পাঁচ তারকা হোটেল তাজমহল প্যালেস হোটেল  বা তাজ হোটেল । ২০০৮ সালের ইসলামি উপগ্রন্থি গোষ্ঠীর আক্রমণের পরে হোটেলের ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়া অংশের সংস্কার করে সেই বছরেই ২১ ডিসেম্বর হোটেলটি পুনরায় খুলে দেয়া হয়। বর্তমানে হোটেলের ২টি ভবন রয়েছে যার একটি সেই সাততলা বিশিষ্ট পুরাতন ভবন এবং আরেকটি নতুন বাইশতলা বিশিষ্ট ভবন যার নাম তাজ মহল টাওয়ার ।   

মৎস্যরাজ্য তারাপরেওয়ালা অ্যাকুরিয়াম 

মেরিন ড্রাইভে অবস্থিত বিশালাকার এই মৎস্যাধার ছিল আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্যস্থল। ভারতের সবচেয়ে পুরাতন অ্যাকুয়ারিয়াম এটি। ১৯৫১ সালে তৎকালীন ৮০০,০০০ রুপি খরচ করে নির্মাণ করা হয় এই মৎস্যাধার। এর নামকরণ করা হয় পারসী বিশ্বপ্রেমিক ডি বি তারাপরেওয়ালা’র নামানুসারে, যিনি এটির  নির্মাণকালে ২০০,০০০ রুপি দান করেছিলেন।  

 Taraporewala Aquarium, Mumbai

২০১৫ সালের ৩রা মার্চ এই মৎস্যাধারের সংস্কার কাজের পর পুনরায় খুলে দেয়া হয়, যার ভিতরে বর্তমানে আছে ১২ ফিট লম্বা ১৮০ ডিগ্রি অ্যাক্রেলিক গ্লাস টানেল। আছে ৪০০ প্রজাতির বেশি প্রায় ২০০০ মৎস্যকূল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী। এই অ্যাকুয়ারিয়ামটি স্বয়ং ভারতীয় মৎস্য বিভাগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জলাধারের পাশাপাশি সেখানে আছে একটি ছোট জাদুঘর যেখানে সামুদ্রিক প্রানির বিবরণের পাশাপাশি আছে কিছু প্রানির সংরক্ষিত অস্তিত্ব।  

আরব সাগরের বুকে এক বিস্ময়হাজী আলীর দরগাহ 

মুসলিম ব্যাবসায়ী সায়েদ সমাধি পীর হাজী আলী শাহ বুখারি’র মাজারকে কেন্দ্র করে ১৪৩১ সালে নির্মিত মসজিদ এবং দরগাহ যেটি উপকূল হতে ৫০০ মিটার দূরে (প্রায় ১ কিলোমিটার) আরব সাগরের মাঝে অবস্থিত। উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে কি করে একটি মাজার বছরের পর বছর অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে – এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার।  

এই সন্ন্যাসী হাজী আলী তাঁর সমস্ত দুনিয়বি সম্পত্তি ছেড়ে মক্কায় হজ করতে রউনা হন। ১৫ শতকে এই সন্ন্যাসী মুসাফির হয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন এবং যাত্রার সমাপ্তি ঘটে এই মুম্বাই শহরে। জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তিনি তাঁর ভাই এর সাথে মুম্বাই শহরে আসেন এবং সেখানে থাকাকালীন তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি তাঁর জীবনের বাকি অধ্যায়টুকু ইসলামের দ্বীন প্রচারে অতিবাহিত করবেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ইসলামের দ্বীন প্রচারে পার করেন এবং তাঁর মুরিদগণ নিয়মিত তাঁর সাথে দেখা করতে যেতেন। তিনি তাঁর মুরিদগণকে অনুরোধ করেন যেন তাঁকে তাঁর মৃত্যুর পর কোথাও দাফন করা না হয়, বরং তাঁর কাফন কে সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয় এবং যেখানে তাঁর সমাপ্তি হবে সেখানে যেন তাঁকে শায়িত করা হয়। ফলস্বরূপ, কাফন আরব সাগরের মাঝপথে এসে থামে এবং ঠিক সেখানেই তাঁর মাজার স্থাপন করা হয়। 

Haji Ali Dargah, Mumbai

মাজারের নির্মাণশৈলীতে ইন্দো – ইসলামিক সংমিশ্রণ দেখা যায়। উপকূল হতে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে  সরু আল ধরে মাজারে যেতে হয়। সাগরের ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করে। সমুদ্র যখন উত্তাল থাকে, তখন সরু সেই আল পুরোটাই পানিতে ডুবে যায়, যে কারণে তখন মাজারে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই শুধুমাত্র ভাঁটার সময়ে এই মাজারে যাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবারে এই মাজারে হাজারো ভক্তের আগমন ঘটে যার মধ্যে শুক্রবারের ভক্তের সংখ্যা বেশি কারণ শুক্রবার সুফি সঙ্গীত পরিবেশকদের বিশেষ কাওয়ালি গানের আসর বসে যে আসরে বসলে ভক্তরা বরাবরই অভিভূত হয়ে যান।   

ভারতীয় জনপ্রিয় অস্কারজয়ী সঙ্গীতশিল্পী এ আর রহমানের পিয়া হাজী আলী  কাওয়ালি গানে এই হাজী আলী দরগাহের বিস্তারিত খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে। 

মুম্বাই সফরের আরও চমকপ্রদ কাহিনী থাকছে পরের পর্বে…

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাতেমা নজরুল স্নেহা

Porjotonlipi

Add comment