Porjotonlipi

দিল্লীর ঐতিহাসিক জামে মসজিদ

পুরাতন দিল্লীর বিখ্যাত জামে মসজিদ ভারতীয় ঐতিহাসিক স্থাপত্যকলার মধ্যে একটি অন্যতম স্থাপনা। লাল বেলে পাথর এবং সাদা মার্বেলের তৈরি এই মসজিদটির স্থাপত্য ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য মসজিদ হইতে অতুলনীয়। এর কারণ হচ্ছে এই মসজিদটির নির্মাণের পর এর  পরিকল্পনা অন্যান্য মসজিদের জন্য একটি ‘ব্লু প্রিন্ট’ হয়ে দারায়।

অসাধারণ নির্মাণ দিল্লীর জামে মসজিদ

জামে মসজিদ নির্মাণের পর  পরবর্তীতে যত মসজিদ বানানো হয়েছে সেগুলোর স্থাপত্যশৈলী এই বিখ্যাত মুঘল আমলের জামে মসজিদ দেখেই। এমন কি লাহোর, পাকিস্তানের বাদশাহি মসজিদটিও একই শৈলী অনুযায়ী সম্রাট আরঙ্গজেবের নির্দেশনায় বানানো হয়েছিল। দিল্লীর জামে মসজিদের নির্মাণকাজ ১৬৪৪ সালে শুরু করেন পঞ্ছম ভারতীয় মুঘল সম্রাট শাহাজাহান (১৬২৮-১৬৫৮) এবং দীর্ঘ ১২ বছর লেগেছে কাজ সম্পূর্ণ করতে। এর নির্মাণকাজে প্রায় দশ লাখ ভারতীয় রুপি এবং পাঁচ হাজার শ্রমিক লেগেছিল এবং শাহাজাহানের প্রধানমন্ত্রী সাইদুল্লাহ খানের তত্ত্বাবধায়নে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

মসজিদ-ই-জাহানুমার ইতিহাস

এই মসজিদটি উদ্বোধন শাহাজাহান নিজেই করেন ২৩ জুলাই ১৬৫৬ সালে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে। এই মসজিদটির আরেকটি নাম মসজিদ-ই-জাহানুমা যার মানে  – ‘বিশ্বের প্রতিফলন ঘটে যে মসজিদে’। এই নাম দাওয়ার কারন, এই মসজিদটি একটি উঁচু প্রাকৃতিক টিলার উপর বানানো হয়েছে,  এবং সেই বড় উঠানে না গিয়ে দাঁড়ালে এই স্থাপনার প্রশস্থতা বোঝা যায় না। উদ্বোধনের জন্য সম্রাট শাহাজাহান উজবেকিস্তানের বুখারা থেকে ইমাম আব্দুল  গফুর শাহ বুখারিকে নিমন্ত্রণ করেছিল। ইমাম আব্দুল গফুর মসজিদ-ই-জাহানুমার প্রথম ইমাম হিসেবে কাজ করেন এবং আজও এই মসজিদের ইমাম উনারই বংশধর।

মুঘল সম্রাট শাহাজাহান ১৬৩৮ সালে তাঁর রাজধানী আগ্রা থেকে পুরাণ দিল্লিতে নিয়ে এসে একটি নতুন শহর যমুনার পূর্ববর্তী তীরে স্থাপন করে যার নাম – শাহাজাহানাবাদ। এই শহরটি দিল্লীর সপ্তম ইসলামিক শহর। এই শহরের উত্তরপূর্ব দিকে তিনি তাঁর বাসভবন দিল্লীর লাল কেল্লা নির্মাণ করেন এবং সেখান থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিমব্দি তৈরি করেন এই বিস্ময়কর জামে মসজিদ। জামে মসজিদটি বানানো হয় দিল্লীর আগেকার পুরনো জামে মসজিদগুলোর সাথে মিল রেখে – একটি মূল নামাজের হল এবং এর পূর্বদিকে একটি বড় উঠান। জামে মসজিদের বাইরের অংশ আকবরের ফতেপুর শিকরির মসজিদের সাথে মিলিয়ে বানানো হয়েছে এবং এর ভেতরের অংশ আগ্রার জামে মসজিদের সাথে মিল রেখে। মসজিদটি এমনভাবে বানানো হয়েছে যে বাহিরের দুনিয়া থেকে একটু বিছিন্নই বলা যায়। মসজিদের চারপাশে প্রায় তিরিশ মিটার খোলা উঠান দিয়ে ঘেরাও করা। আর এটি শহর থেকে প্রায় দশ মিটার উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদ এলাকার প্রস্থ প্রায় ২৮ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার। মূল নামাজের স্থানটি ৭০ মিটার লম্বা এবং ২৫ মিটার চওড়া যেইখানে ২৫০০০ মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পারে। মসজিদটিতে মার্বেলেরে তৈরি ২ টি মিনার, ৪ টি টাওয়ার এবং ৩ টি গম্বুজ আছে। বর্গক্ষেত্রে রয়েছে তিনটি দরজা এবং প্রত্যেকটির সাথে যুক্ত তিনটি সিঁড়ি – শহরে নামার জন্যে।

জামে মসজিদের নান্দনিক  প্রবেশপথ

মসজিদের লাল বেলে পাথরের তৈরি তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে – উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে। সেই তিন দিকেই সিঁড়ি আছে যা দিয়ে মসজিদ থেকে নেমে শহরে নামা যায়। পূর্বের প্রবেশপথটি ব্যবহৃত হতো রাজার দারা তাই এর উচ্চতা তিন তালার সমান যেইখানে উত্তর এবং দক্ষিণ দিকেরগুলোর উচ্চতা দুই তালা সমান। মসজিদটির আরো রয়েছে দুইটি ৪০ মিটার উঁচু মিনার এবং চারটি টাওয়ার। প্রবেশপথ গুলো লাল বেলে পাথরের ফিনিশিং দাওয়া এবং নামাজের দিক নির্দেশনার জন্যে শিরির রাইজার গুলোতে সাদা দিয়ে চিনহিত করা। পূর্বের গেটটি উত্তর-দক্ষিন অব্দি ২০ মিটার টানা ওয়াল এবং পূর্বপশ্চিম অব্দি চলে গিয়েছে। এই প্রবেশপথটি একটি চারকোনা স্থাপত্য যার মাঝখানে রয়েছে পিশ্তাক (Iwan) – যেটা একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক স্থাপত্যশৈলী। প্রত্যেকটি তালায় চারিদিক দিয়ে খিলান করে বারান্দা করা – যেইখানে আবার যাওয়াও যায়। এই প্রবেশপথটির পিছন দিকে একটা বড় খিলান করা দরজা আছে যেটা দিয়ে এর অভ্যন্তরে ঢুকেই সুন্দর গম্বুজ ছাদ দেখা যায়। আর এর ভিতর দিয়েই উঠানে প্রবেশ করে। এই পিশ্তাক (Iwan) প্রবেশপথ গুলোর ছাদগুলো অবিছিন্ন ছোট ছোট খিলানযুক্ত ওয়াল দিয়ে ঘেরাও করা। এই খিলানযুক্ত ছাদের বেড়ার উপরেও রয়েছে খিলানযুক্ত জানালা করা ওয়াল এবং সবার উপরে আছে ২৫ টি সাদা মার্বেলের তৈরি ছোট ছোট গম্বুজ। প্রবেশপথটির উপরে চারকোনায় চারটি উত্তল শইলশিরাময় মিনার উঠে গেছে। মসজিদের চারিপাশ দিয়ে যেই খিলানে ঢাকা পথ আছে – সেইগুলোর ২ টি পথ যেই কোনায় মিলিত হয় সেই কোনাগুলোর মিনারগুলোর উপড়ের গম্বুজগুল অষ্টভুজ।

জামে মসজিদের প্রাঙ্গণের বর্ণনা

মসজিদের প্রাঙ্গণের মেঝে লাল পাথর দিয়ে গঠিত কিন্তু এর মাঝখানে মাঝখানে সাদা মার্বেলের পটি দিয়ে নামাজের জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাঙ্গণের চতুর্দিকে এক প্রবেশপথ থেকে আরেকটি জুরে আছে খিলানে ঢাকা পথ- যার বাইরে দিয়ে লাল কেল্লা এবং শহর দেখা যায়। একটি চারকোনা অজুর ট্যাঙ্ক এই প্রাঙ্গণের মাঝখানে অবস্তিত রয়েছে। এই ট্যাঙ্কটি  ৩ মিটার সাদা মার্বেলের মাচার উপর অবস্থিত এবং এর চার কোনায় রয়েছে মার্বেলের ল্যাম্পপোস্ট এবং ট্যাঙ্কের মাঝখানে সাদা মার্বেলের ফোয়ারা।

জামে মসজিদের নামাজের হল

নামাজের হলের দৈর্ঘ্য ৬১ মিটার প্রস্থ ২৭ মিটার। নামাজের স্থানের তাৎপর্যতার কারণে এটিকে  ১.২ মিটার উত্থাপিত করে বানানো হয়েছে।মসজিদের সামনের পিশ্তাকটি সাদা মার্বেলের উপরে লাল বেলে পাথরের নকশা করা। পিশ্তাকের উপরে খিলানযুক্ত ওয়ালের বেড়া করা এবং সামনের দুই কোনায় চিকন দুটি মিনার আছে। পিশ্তাকটির ভিতরের দেয়ালটিই নামাজের স্থানের মূল প্রবেশপথ। এটিও একটি খিলান করা দরজা। পিশ্তাকের অর্ধ গম্ভুজ ছাদটা লাল বেলে পাথরের উপর সাদা মার্বেলের নকশা করা। পিশ্তাক ঘেঁষে দুই দিকে দুটি খিলানপথ আছে যেই দুটিই আবার মিলে যায় দুটি ৪০ মিটার উঁচু লাল বেলে পাথরের মিনারের সাথে। এই দুটি খিলানে ঢাকা পথে ৫ টি করে খিলানযুক্ত জানালা আছে এবং এই জানালা গুলোর উপরে মোটা সাদা মার্বেলের স্লাব আছে লাল বেলে পাথর দিয়ে বর্ডার করা। সেই স্লাবে আরবি শিলালিপি করা আছে। মার্বেলের স্লাবের উপরেও সুন্দর ছোট ছোট খিলানযুক্ত ছোট বেড়া করা – যেইটা পিশ্তাকের উপরে আছে। মিনারে উঠার জন্যে ১৩০ টা পেঁচালো শিরি আছে এবং ৩ টি বারান্দা আছে যেইগুলোতে যাওয়া যায়। পিশ্তাকের পিছে রয়েছে সাদা মার্বেলের তৈরি তিনটি বড় আকারের কন্দজ গম্বুজ। সাদা মার্বেলের উপর কাল মার্বেলের নকশা করা এবং গম্বুজের চূড়ায় সোনালি চক্ষা অলংকার দাওয়া।

পিশ্তাকের ভিতরে ছোট সিঁড়ি রয়েছে যা বেয়ে নামজের স্থানে ঢুকতে হয়। ভিতরে নামাজের হলটি দুটি আইলে ভাগ করা। ভিতরের আইলটি মেহরাবের দিকে মুখ করা। হলের ফ্লোর জুরে রয়েছে লাল বেলে পাথর এবং সাদা মার্বেলের কারুকাজ। নামাজের হলের দেয়াল গুলো প্রায় ২.৫ মিটার পর্যন্ত সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এবং তাঁর উপরের দেয়াল এবং সিলিং পুরটাই লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি। পশ্চিমা দেয়ালটি এমনভাবে কুলুঙ্গি দিয়ে নকশা করা যে তা ফ্লোরের কুলুঙ্গির সাথে মিলে যায়। মূল মেহেরাবের কুলুঙ্গিটি একটি খিলান যা পুরাটাই সাদা মার্বেলের তৈরি এবং জটিল কারুকাজ দিয়ে অলঙ্কৃত। বাইরের আইলটি সেই খিলানে ঢাকা পথের সাথে মিলে মূল পিশ্তাকের দুই পাশে বিভক্ত। নামাজের হলের ফ্লোরটি সাদা মার্বেল দিয়ে বানানো এবং তার উপরে জায়নামাজের নকশা করা ।

আজও জামে মসজিদ হাজার হাজার মুসল্লির জামাত আয়োজন করে যাচ্ছে। তার পাশাপাশি মসজিদটি তার সৌন্দর্য ও অভিজাত স্থাপত্যশৈলীর সাথে ধরে রেখেছে এই ঐতিহাসিক শহরের ঐতিহ্য।

কন্টেন্ট রাইটার- রায়া

 

Porjotonlipi

Add comment