Porjotonlipi

উৎসবে আমেজে, ইফতার আয়োজন

ইফতার আয়োজন মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি আবেগের জায়গা। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সারাবছরের মধ্যে মধুরতায় পূর্ণ হচ্ছে আরবী বছরের নবমতম মাস রমজান। রোজা রাখার মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি সংযম প্রকাশের এই মাস মুসলমানদের কাছে নানা কারণে পবিত্র এবং বিখ্যাত।

সারাবিশ্বের ইফতার আয়োজন

এই পবিত্র মাসকে ঘিরে সারা মুসলিম বিশ্বে রোজা রাখা, তারাবিহর নামাজসহ থাকে নানাবিধ ইফতার আয়োজন। এই সকল আয়োজনের মাধ্যমে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব খুশির আমেজ। যে আমেজকে উৎসবে পরিণত করে ইফতার মাহফিল। অধিকাংশ দেশেই আজানের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সপরিবারে মোনাজাতের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া চেয়ে শুরু হয় ইফতার পর্ব।

মুসলিম দেশগুলোর ইফতার আয়োজন

রমজান মাসের এই ইফতারকে ঘিরে বিশ্বের প্রতেকটি দেশের নিজস্ব রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য অনুসারে নানাভাবে উদযাপিত হয় ইফতারের আয়োজন।

যেমন তুরস্কের অধিবাসীরা ইফতারে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করে থাকে। তাই তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ পেতে রমজান মাসের বিকল্প সময় নেই বললেই চলে। ইফতারের খাবার তালিকায় তুর্কিরা ‘পিডে’ নামক একধরনের গরম এবং তাজা রুটি খেয়ে থাকেন। এছাড়াও খেজুর, হরেক রকম সবজির তৈরি সালাদ, মাংসের কিমা, খোপতে, পাস্তিরমাহ এবং বিভিন্ন ধরনের কাবাব জাতীয় খাবার থাকে। তবে একজন তুর্কির ইফতার টেবিলে অবশ্যই নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী স্যুপ থাকতেই হয়।

আবার, মালয়শিয়ানরা ইফতারকে ‘বারবুকা পুয়াসা’ বলে থাকে। খেজুর এবং পানির মাধ্যমে ইফতারের সূচনা হলেও পরে বান্দুং, আখের রস, ঘাস জেলির সাথে সয়াবিন দুধ, নাসি লোমাক, চিকেন রাইস, লাকসা জাতীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার দ্বারা তারা ইফতার সম্পন্ন করে থাকেন।

এছাড়া, মিশরীয়রা হাঁস, রোকাক, মাহশি, কেশক, খরগোশ এবং মোলোখোয়ার জাতীয় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার দ্বারা ইফতার সম্পন্ন করে। তবে মিশরীয়দের ইফতার উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ তাঁরা ইফতারের সময়ে রঙিন ফানুস জ্বালায়।

আরেক মুসলিম দেশ ইরানে স্যুপ, খেজুর, কলা, দুধ, পনির, রুটি, মধু, আপেল, চেরি, তরমুজ ইত্যাদি নানা রকমের বাহারি ফলমূল দিয়ে সাজানো হয় ইরানীদের ইফতার টেবিল। গরমের সময়ে পিচ নামে এক ধরনের বিশেষ ফল পাওয়া যায়। টমেটো, শসা, লেটুসপাতার সালাদের পাশাপাশি পুদিনা ও ধনিয়াপাতার মত সুগন্ধযুক্ত পাতা থাকে তাদের ইফতারে। এছাড়াও নিজেদের ঐতিহ্যবাহী জিলাপি, হালিম, স্যুপ, পায়েশ তো থাকেই৷

সবশেষে আসে সৌদি আরব, যা মুসলিম বিশ্বের কাছে অতন্ত্য পবিত্র এক ভূমি। মহানবী (সঃ)-এর জন্মভূমিসহ ইসলামের নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই মুসলিম নগরী। তাই আরবীয়দের ইফতারের প্রতি নিবেদনও একটু বেশি। অঞ্চলভেদে ইফতারের ভিন্নতাও রয়েছে সৌদি আরবে। যেমন- পশ্চিমাঞ্চলের লোকেরা নিজেদের বিখ্যাত ‘ফাউল’, ‘টেমিস’ জাতীয় খাবার দিয়ে ইফতার করে থাকেন। একইভাবে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের লোকেরা মাংস এবং উদ্ভিজ্জ স্টু দিয়ে তৈরি ‘সালুনা’ নামের এক ধরনের পরিচিত খাবার দিয়ে ইফতার সম্পন্ন করে থাকেন। তবে ইফতারের সূচনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই ধরনের হয়ে থাকে, সকলেই খেজুর এবং পানি দিয়ে ইফতারের সূচনা করে থাকেন।

যেমন হয় উপমহাদেশীয় ইফতার

ভারত, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানসহ উপমহাদেশীয় ইফতার চিত্র তূলনামূলক একইরকমের হয়ে থাকে, যেখানে জিলাপি, মুড়ি, ছোলা, বিভিন্ন রকমের বেগুনি-চপ, সিঙ্গারা, সমুচা, পিঠা, পাকোড়া, হালিম, এবং বিভিন্নধরনের ফলমূলের আধিক্য দেখ যায়। এছাড়াও খেজুর, শরবত, দুধ, ফলের রস ইত্যাদি খাবার উপমহাদেশীয় মুসলিমদের ইফতার টেবিলে থাকা রীতিমত আবশ্যক।

যেখানে সবাই এক

বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি আলাদা হবার ফলে ইফতার আয়োজনেও প্রত্যেক জাতির পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য এবং আমেজ বা আয়োজনের ক্ষেত্রে সকলের উৎসাহ যে একইরকম তা সহজেই অনুমেয়। ইফতার আয়োজন এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে মসজিদ বা পাড়া-প্রতিবেশি সকলে মিলে একসাথে ইফতারে অংশগ্রহণ করা। ইফতার শুরুর আদিকাল থেকে এই প্রথা প্রচলিত হয়ে আছে, যা সারাবিশ্ব জুড়ে এখনও সমাদৃত। কিন্তু ২০২০-২০২১ সালের এই দুইবছর রমজানে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল। যে কারণে উৎসব, আয়োজনের চাইতে উৎকন্ঠায় জর্জরিত ছিল সকল বিশ্ববাসী। তাই  ইফতারের আয়োজন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু দুইবছর বাদে করোনাকাল সমাপ্তির পরে নতুন উদ্যমে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে পবিত্র মাহে রমজানের ইফতার আয়োজন। বাংলাদেশের চকবাজার থেকে পাকিস্তানে ইসলামাবাদ বা ইরানের তেহরান-  সবখানে তুমুল উৎসাহ এবং প্রবল আগ্রহে পালিত হচ্ছে ইফতার বিকি-কিনির এই আয়োজন। আমাদের একাত্বতা প্রকাশের এই অনুভূতি বিরাজমান থাকুক বছর জুড়ে এবং বিশ্বব্যাপী উৎসবের আমেজে নিরবচ্ছিন্নভাবে পালিত হোক ইফতারের এই আয়োজন।

রাইটার- ওমর মুহাম্মদ ফারুখ

 

Porjotonlipi

1 comment