Porjotonlipi

ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুর

লোকমুখে ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুর “আলুর দেশ” নামে অধিক পরিচিত হলেও বিক্রমপুর আসলে শুধু আলুর জন্যই জনপ্রিয় নয়। বিরাট ইতিহাসের পাশাপাশি হরেক রকমের মিষ্টি ও পিঠাপুলির সমারোহ। রাজধানী ঢাকা হতে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তরগত বিক্রমপুরের অবস্থান। যাতায়াত করার জন্য তেমন কোন ঝামেলা নেই, গুলিস্তান থেকে বাস এ করে অথবা নিজেদের যানবাহন দিয়েই বিক্রমপুর দিনে গিয়ে দিনেই ঘুরে আসা যায়। বিস্তৃত মহাসড়ক এর সুবিধায় বহুল আলোচিত পদ্মাসেতু পর্যন্ত যেতে সর্বমোট সময় লাগে প্রায় ঘণ্টাখানেক।

মিষ্টিমুখর বিক্রমপুর

ইতিহাস ও নামকরণ

ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুর এর ইতিহাসের কথা বলতে গেলে তালিকায় সর্বপ্রথমে নাম আসে মৌর্যসাম্রাজ্যের সম্রাট অশোক। খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৯ সাল থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ২৩২ সাল পর্যন্ত প্রায় উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের অনুসারী হওয়ায় সারা সাম্রাজ্য জুড়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছিলেন যার মধ্যে সাম্রাজ্যের পূর্বে অবস্থিত বিক্রমপুরও ছিল । তালিকার পরবর্তীতে আসে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল – যার শাসনকালের স্থায়িত্ব ছিল ৭৭০ থেকে ৮১০ খ্রিস্টাব্দ অবধি । পরবর্তীতে সেন সাম্রাজ্য আক্রান্ত হলে  ১১৭৪ সালে রাজ্য ভাঙ্গন এর ফলে পাল সাম্রাজ্যর অবসান ঘটে । এরপরে তালিকায় নাম আসে চন্দ্রযুগের রাজা শ্রীচন্দ্রের শাসনকাল যার স্থায়িত্ব ছিল ৯৩০–৯৭৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত যে সময়তে বিক্রমপুরে চন্দ্র সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পর্যায়ক্রমে আসে মুঘল সম্রাট আকবর যার ১৫৭২ – ১৫৮০ সালের প্রশাসনিক সংস্কারের সময় বিক্রমপুরকে একটি পরগণা  হিসেবে অন্তরভুক্ত করেন । আকবরের সময়কালে চাঁদ রায় এবং কেদার রায় বিক্রমপুরের জমিদার ছিলেন ।

আওরাঙ্গজেবের রাজত্বকাল শেষে নবাব মুরশিদকুলী খাঁ এর আমলে বিক্রমপুরকে ৮টি তালুকে ভাগ করা হয় যেগুলো হল ভাগ্যকূল, শ্রীনগর, মাইঝপাড়া, সিনহাপাড়া, তালতলা, সিরাজদিখান, লৌহজং এবং বালিগাঁও – প্রতিটি তালুকের একজন জমিদার ছিলেন।

ধারণা করা হয়, বিক্রমপুর নামটি আসে বীর বিক্রমাদিত্য থেকে যিনি হিন্দু পুরাণের একজন রাজা ছিলেন। তবে কয়েকজন শাসক যেমন চন্দ্রগুপ্ত ২, ধর্মপাল, সম্রাট হেমু সহ কয়েকজন “বিক্রমাদিত্য” পদবীটি গ্রহন করেছিলেন, যার কারণে এটি এখন অস্পষ্ট যে কার নামানুসারে বিক্রমপুর নামকরণ হয়। তবে, যারা বিক্রমপুরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং যাদের শৈশব বিক্রমপুরের গ্রামে অতিবাহিত হয়েছে, তারা দাবী করেন যে বিক্রমপুর নামটি রাজা বীর বিক্রমাদিত্য এর নামানুসারেই রাখা হয়েছে। বিক্রমপুর নামের প্রথমাংশ ‘বিক্রম’ অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং শেষাংশ ‘পুর’ অর্থ নগর বা এলাকা, যা উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গার নামের শেষে ব্যবহার করা হয়।

ফটো ক্রেডিট- ইসতিয়াক কবির শুভ

ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুর এর মুখরোচক খাবার

বিক্রমপুরের মিষ্টি এবং পিঠাপুলি খুবই সুস্বাদু এবং বহুল পরিচিত। এদের নাম গুলো যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন মজা। শুরুতে আসা যাক মিষ্টির কথায়। ভাগ্যকূলের মিষ্টি একনামে সবাই জানে। ভাগ্যকূল বেড়াতে গেলে “গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” এ ঢুঁ মারার জন্য অনুরধ রইল। এই দোকান এর মিষ্টি যেমন- পুডিং, সন্দেশ, রসগোল্লা, বালুশাই, দই, ঘোল এবং মাঠা এর স্বাদ অপূর্ব। দোকানটি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, এবং খাবারের দাম ও হাতের নাগালে। এছাড়াও আছে সিরাজদিখান এর পাতক্ষীর বা খিরসা, নবাবগঞ্জের মিষ্টি, রসগোল্লা, রসমালাই।

এরপরে বলি পিঠাপুলির নাম। ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুর এর পিঠার নামগুলো বেশ লক্ষণীয়। কুলিপিঠা, বিবিখানা, মুখশলা, পাটিসাপটা, সেমাই পিঠা, কাঁঠাল পাতার পিঠা, ভাপা পিঠা – আরও অনেক। কিছু কিছু পিঠার আবার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যও আছে। যেমন মুখশলা পিঠা। এই পিঠাটি বানানো বেশ কষ্টসাধ্য। বিক্রমপুর খানদান এ বিয়ে শাদীর সময় এই পিঠাটি খুব বানানো হয়ে থাকে জামাইবাড়ির অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য। এরজন্য এই পিঠার আরেক নাম “জামাই পিঠা”। শীতের সময় গ্রামাঞ্চলে দাদি-নানিরা এখনও এসব সুস্বাদু পিঠা বানিয়ে থাকেন।

এরপরে আসি নদীর মাছের কথায়।  বিক্রমপুর এর চারপাশেই কয়েকটি নদী রয়েছে। পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী, এছাড়াও রয়েছে ছোটখাটো পুকুর যেখানে অনেকে মাছ চাষ করে থাকে। আড়িয়াল বিলের কৈ মাছ বেশ নাম করা, এছাড়া আছে সাগরপোনা। গ্রামের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখলে অনেক বিশালাকৃতির মাছ চোখে যেগুলোর দাম ঢাকার বাজারের তুলনায় অনেক কম।

শাকসবজি, ফলমূলের ক্ষেত্রেও হরেক সমারহ চোখে পরে। রামপালের সাগরকলা একসময়কার সুস্বাদু ফল ছিল, যেটা এখন সেরকম দেখা যায় না।

বিক্রমপুরের নিজস্ব কিছু খাবার আছে যেগুলো কালের পরিক্রমায় অন্যান্য জেলার মানুষের ঘরেও রান্না হতে দেখা যায়। সেই খাবারের মধ্যে যার নাম সবার আগে আসে সেটা হল খুদের ভাত সাথে হরেক পদের ভর্তা যেমন- আলু, ডাল, করলা, ডিম, বেগুন, কালোজিরা, মরিচ, ধনে পাতা, শুটকি, সিম, আরও অনেক। তারপরে নাম আসে চাপটি (দেখতে অনেকটা ইন্ডিয়ান দোসা এর মত কিন্তু মাঝারি আকারের এবং ঝাল) সাথে ধনেপাতা অথবা মরিচ ভর্তা। তারপরে আসে কাজির ভাত, যেটা বিক্রমপুরের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার, সাথে আবারো রকমারি ভর্তা। সবশেষে বলি, বিক্রমপুর এবং ভর্তা – দুটো একটার সাথে অন্যটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নিজস্ব সংস্কৃতি

বিক্রমপুরের মানুষ অতিথিপরায়ন করার ক্ষেত্রে অনেক পটু। গ্রামের বাড়িতে মেহমান স্বরূপ  গেলে তাদের আন্তরিকতা মনে দাগ কাটার মত। আপ্যায়ন শুরু হয় নানান রকমের পিঠা দিয়ে যেগুলার নাম আগেও বলেছি। এছাড়াও থাকে পোলাও, মাংস ভুনা, ডিমের কোর্মা, কাবাব ইত্যাদি। একটা কথা না বললেই নয়, তা হল গ্রামের খাবারের স্বাদ অন্যান্য জায়গার তুলনায় খুব এ ভিন্ন এবং খুব মজার। বিক্রমপুর সেই ক্ষেত্রে কোন অংশে কম নয়।

গ্রামের মত ঢাকার বিক্রমপুর পরিবারগুলো একই রক, আতিথেয়তায় কোন বেলায় কম নয়। তারা মেহমান খুশি করার বেলায় টাকা খরচ করার জন্য দ্বিধাবোধ করেন না। আত্মীয়র বাসায় যাওয়ার সময় ৫ কেজি এর নিছে মিষ্টি কেনার কথা তারা চিন্তাও করতে পারেন না। তাই পাঠকদের জন্য একটা ছোট্ট পরামর্শ। যদি কোন বিক্রমপুরের মানুষের সাথে পরিচয় বা বন্ধুত্ব হয়ে থাকে, তাদের থেকে কোন নিমন্ত্রন পেয়ে থাকলে সে সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

ফটো ক্রেডিট- ইসতিয়াক কবির শুভ

পর্যটন কেন্দ্র

এবার আসি ঘুরাঘুরির কথায়। বিক্রমপুরে এখন অনেক পর্যটকদের আগমন যাদের প্রধান গন্তব্য পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দেখতে যাওয়া অথবা মাওয়ার ইলিশ মাছভাজা খেতে যাওয়া। কিন্তু বিক্রমপুরে এ দুই ছাড়াও আরও বেশ ঘুরার জায়গা আছে, যাদের মধ্যে পদ্মা রিসোর্ট বহুল পরিচিত। এছাড়া আছে মাওয়া রিসোর্ট, বিক্রমপুর মিউসিয়াম, ইদ্রাকপুর কেল্লা, সোনাকান্দা কেল্লা, বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি, জমিদার যদুবাবুর বাড়ি। সবশেষে বলব পদ্মা নদীর পাড়ের কথা, যেখানে বিকালে ভ্রমন করলে অপূর্ব সুন্দর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়।

ফটো ক্রেডিট- ইসতিয়াক কবির শুভ

সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে শহরের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে বিক্রমপুরেও একটা শহুরে ভাব চলে আসছে, কিন্তু তার মধ্যেও সেখানে গিয়ে ঘুরে আসলে খুব ভাল লাগে। পরিবার অথবা বন্ধুদের সাথে সময় করে একটি মাত্র দিন হাতে নিয়ে খুব সহজেই বিক্রমপুর থেকে ছোটখাটো একটা ট্যুর দিয়ে আসা যায়, সাথে খরচও খুবই সীমিত।

আপনার মন্তব্য দিন

বিক্রমপুর নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনাদের কোন মতামত বা জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের জানাতে পারেন। আর ভ্রমনের সময় এমন কিছু করবেন না যা আমাদের পরিবেশ, প্রকৃতি এবং সর্বোপরি আমাদের পর্যটন শিল্পের জন্য হুমকি স্বরূপ। আগামী পর্বে বাংলার আরো কিছু চমক নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হবো। আশা করছি পর্যটনলিপির সাথেই থাকবেন, ধন্যবাদ।

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাতেমা নজরুল স্নেহা

 

Porjotonlipi

2 comments