Porjotonlipi

ভারতবর্ষ ভ্রমণে, ইতিহাসের সন্ধানে (পর্ব ৫)

গোলাপি শহর জয়পুর ভ্রমনের পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আজমির শরিফ । ১৩৬ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১০টা নাগাদ আমাদের আজমির শহরে প্রবেশ।

রাজস্থানের পবিত্রতম শহর – আজমির

হোটেলে সেদিনকার মত রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে আমাদের মাজার শরিফ দেখার উদ্দেশে রউনা। আমাদের হোটেল থেকে মিনিট বিশেকের দুরত্তে মাজার শরিফ। হেটেই পৌঁছালাম সেখানে। ভিতর প্রাঙ্গন সম্পর্কে বলার আগে জেনে আসি আজমিরের ইতিহাস।

স্বল্পদৈর্ঘ্য ইতিহাস

আজমিরের পথচলা অজয়দেবা’র হাত ধরে – যিনি ছিলেন ১১ শতকের রাজপুত শাসক। এই আজমির শহর ১১৯৩ সালের দিল্লি সুলতানের দাস প্রথার মধ্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। পরবর্তীতে ১৫৫৬ সালে শাসনকাজের দায়িত্ব নেন সম্রাট আকবর, ১৭৭০ সালে যেই শাসন চলে যায় মারাঠাদের হাতে। ব্রিটিশ শাসনকাল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আজমির রাজপুত- মারাঠাদের এক চলমান রণক্ষেত্র ছিল। ১৮৭৮ সালে আজমির প্রধান কমিশনারের প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয় যার নাম রাখা হয়েছিল আজমির-মেরওয়ারা, যেটি দ্বিবিভক্ত ছিল। বড় বিভাগের নাম আজমির – মেরওয়ারা এবং ছোট বিভাগের নাম কেকড়ি। এই আজমির রাজাস্থানের অংশ হয় ১৯৫৬ সালে।

আজমির শরিফ মাজারের বর্ণনা

আজমির শরীফের প্রাতিষ্ঠানিক নাম হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ দরগাহ। দরগাটি তাড়গড় পাহাড়ের নিচে অবস্থিত, ভিতরে ২টি আঙিনা সহ কয়েকটি সাদা মার্বেলের ভবন রয়েছে। মাজারটি মোঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করিয়েছিলেন। যে ফটক দিয়ে মাজারে প্রবেশ করতে হয়, সেই ফটকটি হায়দ্রাবাদের নিজাম মীর ওসমান আলী খান এবং আকবরী মসজিদের দান করা একটি ফটক। ফটক থেকে কিছুটা আগালেই দেখা যায় পারস্য সুফী সন্যাসী খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর মাজার।

আজমির শরিফ

নিজের ভাষায় মাজারের বর্ণনা

বিশাল ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় হাজারো মুসল্লির ভিড়। যে যার মানত নিয়ে হাজির হয়েছে এই দরগায়। রাজাস্থানের পবিত্রতম স্থানের মধ্যে একটি এই মাজার শরিফ। এই মাজারের দর্শনে দুরদুরান্ত থেকে আসে আমাদের মত হাজারো পর্যটক। খালি পায়ে হেঁটে আমরা পুরো মাজার ঘুরে দেখছিলাম। ভিতর প্রাঙ্গনে গেলে দেখা যায় ডান এবং বাম পাশে রয়েছে ২টি বিশালাকার ডেকচি। তবে দুটির মধ্যে রয়েছে ছোট এবং ডেকচি। বড় যেই ডেকচি টি রয়েছে, সেটি সম্রাট আকবরের দেয়া, যেটা তে সকল প্রকার ঘি, চিনি, চাল, এবং সর্ব প্রকারের শুকনো ফল শিরনি হিসাবে ফেলা হয়। বড় ডেকচি টি ৩৭ ফিট প্রশস্ত এবং এর ধারণক্ষমতা ৪৮০০ কেজি। ছোট যে ডেকচি টি রয়েছে, সেটি সম্রাট জাহাঙ্গীরের দেয়া, যেটা তে শুধুমাত্র চাল শিরনি হিসাবে ফেলা হয় এবং এটি ২২ ফিট প্রশস্ত, এর ধারণ ক্ষমতা ২৪০০ কেজি। এই ডেকচি এর নিচে রয়েছে লাকড়ি স্থাপনের জন্য জায়গা, যেখানে আগুন জ্বেলে সরাসরি ডেকচি তে শিরনি রান্না করা হয়। প্রতিদিন দুপুরের সময় হাজারো ধনী- গরিব মানুষের জন্য এই শিরনি রান্না করা হয় এবং এই শিরনি পরিবেশনের জন্য রয়েছে ২টি বিশেষ খাবার ঘর যার এক ঘরে শুধুমাত্র শিশু এবং মহিলাদের অবস্থাম, অন্য ঘরে পুরুষদের। আজমির শরিফ দরগা শুধু মুসলমানদের জন্য বরাদ্দ নয় – এখানে সকল ধর্মের মানুষদের মানত গ্রহন করা হয়। দেখা যায়, মানত করতে আসা রাজাস্থানি পোশাক পরিহিত মহিলাদের।

পীরের দরগার ভিতরে প্রবেশ করলে পুরো দৃশ্যই যেন বদলে যায়। ভিতরের পরিবেশ বাহিরের চেয়ে অনেক ঠাণ্ডা, অনেক নীরব – যে যার মত মানত করতে  মনযোগী। বলা হয়ে থাকে, এই মাজারে যে যাই মানত করে থাকে, তার সেই মানতই পূর্ণ হয়। এর জন্যই এত দূর দুরান্ত থেকে হাজারো ধর্মের – বর্ণের মানুষের আগমন।

আজমির শরিফ

আমাদের রেলযাত্রার গপ্পো

আজমির থেকে বিকেল ৪.৩০ এর ট্রেনে আমাদের ভারতের আরেক শহর মুম্বাই এর উদ্দেশে যাত্রা। আমরা পুরো ভারতবর্ষ এই ভারতীও রেলগাড়িতে করেই ঘুরেছি, এবং এই ভ্রমণও আমাদের যাত্রায় এক অন্যরকম আনন্দ যোগ করেছে। আমরা সবাই জানি ভারতের আয়তন সম্পর্কে – বিশাল বড় এক দেশ এই ভারত সাম্রাজ্য, যে কারণে ট্রেনে করে এক জায়গা থেকে থেকে অন্য জায়গায় যেতে সর্বনিম্ন ১দিন সময়ের দরকার হয়। ভারতে এই ট্রেনে করেই মানুষের নিত্যদিনের চলাচল। লোকাল ট্রেনগুলোতে দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু দূরপাল্লার ট্রেনগুলোর চিত্র পুরই বিপরীত। পরিমিত যাত্রী, প্রশস্ত জায়গা, ৩টিয়র বিশিষ্ট কেবিন, যেখানে রয়েছে বড় জানালা। এত দীর্ঘ সময়ের যাত্রা হলেও বিরক্ত লাগবে না এক মুহূর্তের জন্য। বাহিরের দৃশ্য দেখতে দেখতে, গান শুনতে শুনতে, বই পড়তে পড়তে সময় কেটে যাবে চোখের নিমিষেই। লোকাল ট্রেনে লোকসমাগম বেশি থাকলেও ট্রেনের ভিতরের দৃশ্য যেন বলে অন্য কথা। ভারতীও নাগরিক তাদের সম্পদ সংরক্ষনের জন্য অনেক সচেতন। ভারতে গিয়ে মেট্রোরেল, লোকাল ট্রেন এবং দুরপাল্লার ট্রেন ভ্রমণ করলে সেই বিষয় টা অনেক সহজেই বুঝতে পারা যায়।

কন্টেন্ট রাইটারঃ ফাতেমা নজরুল স্নেহা

Porjotonlipi

1 comment