বন্ধুরা আজ আমরা আপনাদের নিয়ে যাব হামহাম জলপ্রপাতের পাদদেশে। হামহাম এর অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্ট। তবে হামহাম যাবার পথে বন্ধুরা খুব সতর্ক থাকতে হবে। কেননা হামহাম যাবার পথ বেশ দুর্গম এবং বর্ষায় এই পথের মাটি বেশ আঠালো। আর এই এলাকা কিন্তু জোঁকের অভয়ারণ্য বলতে পারেন। তবে হামহামের সৌন্দর্যের কাছে এই সকল কষ্ট এক মুহূর্তেই হার মানবে, কথা দিলাম।
দু’পাশে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে পায়ে হেটে চলে যাবেন রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের দিকে। গহীন অরণ্য ঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এটি। আর এর ভেতরই লুকিয়ে আছে নৈসর্গিক এই জলপ্রপাত। লোকালয় আর শহর থেকে দূরে হওয়ায় যাওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তবে চা বাগানের সরু রাস্তা দিয়ে সিএনজি নিয়ে কমলগঞ্জের একেবারে শেষ গ্রাম কলাবনপাড়া পর্যন্ত আসা যায়। জায়গাটি তৈলংবাড়ি নামেও পরিচিত। এক্ষেত্রে সিএনজি রিজার্ভ করে নিয়ে আসাই ভালো। মূলত, এই তৈলংবাড়ির পর থেকেই আর তেমন কোনো জনবসতি নেই। আর এখান থেকেই শুরু হয় হামহাম যাওয়ার আসল অ্যাডভেঞ্চার।

Hamham

চারদিকে বাঁশবন আর, ঘনজঙ্গল। কখনোবা খাড়া পথ বেয়ে নামতে হবে, আবার কখনো খাড়া বেয়ে উপরে উঠতে হবে। একপাশে খাঁদ, আরেক পাশে ঘনজঙ্গল। প্রচণ্ড কষ্ট উপেক্ষা করে সকলের লক্ষ্য নতুন কিছু দেখার। নতুন কিছু আবিষ্কারের। যতোই বনের গভীরে যাবেন, ততোই নীরবতা বাড়বে। কখনো কখনো এই নীরবতা ভাঙ্গছে ঝিরি পথের বহমান পানির কল কল আওয়াজে। আবার কখনওবা অজানা কোনো পাখির ডাকের শব্দে।

কিছুদিন আগেও শহুরে মানুষদের কাছে অনেকটা অজানাই ছিলো এই ঝর্ণা। এই বুনো পথে আপনাকে প্রায় ৩ ঘণ্টা হাটতে হবে। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে এই পথটি। ভর দুপুরে গাছের ফাঁক দিয়ে আসা মৃদু আলো এই সৌন্দর্যের সঙ্গী। আর এতো কিছুর পর যখন দেখবেন ১৬০ ফিট ওপর থেকে নেমে আসা জলরাশির সেই অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য তুখন সকলেই কিছুক্ষণের জন্য হয়তো বাকরুদ্ধ হয়ে যাবেন। যেনো বছরের পর বছর ধরে রাখা নিজের যৌবন আপনাদের দেখানোর জন্যই সে অপেক্ষা করছিলো। প্রবল ধারায় উপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানি। সঙ্গে চারদিকে হিমশীতল পরিবেশ। এক নাগাড়ে ছোটবড় পাথরের ওপর পড়ে যাচ্ছে ঝরনার পানি। এত তৈরি হচ্ছে এক কুয়াশাময় পরিবেশ।

Hamham3

যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যাওয়ার সরাসরি বাস আছে। ভাড়া ৪০০-৪৫০ টাকা। এছাড়া শ্রীমঙ্গল থেকেও যাওয়া যায়। মৌলভীবাজার থেকে যেতে হবে কমলগঞ্জ। সেখান থেকে আদমপুর বাজার, বাস ভাড়া ১৫-২০ টাকা। এখান থেকে ২০০-২৫০ টাকা সিএনজি ভাড়ায় পৌঁছে যেতে পারেন আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ি বা কলাবনপাড়ায়। এরপর হাঁটা রাস্তা। প্রায় ৮ কিলোমিটারের মতো পাহাড়ি পথ শেষে হামহাম ঝর্ণার দেখা মিলবে। তবে যেখান থেকেই যাওয়া হোক, কলাবনপাড়ার দিকে অবশ্যই সকালে রওনা হতে হবে।

যেখানে থাকবেন: থাকার ব্যবস্থা বলতে যাওয়ার আগে শ্রীমঙ্গলে এক রাত থেকে পরদিন খুব ভোরে উঠে রওনা দিয়ে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যার পরে শ্রীমঙ্গল ফিরতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে হামহাম থেকে সন্ধ্যার আগেই কলাবনপাড়ায় ফিরতে হবে।

Hamham2

সাবধানতা

১. যাওয়ার আগে অবশ্যই কলাবনপাড়ার স্থানীয়দের কাছ থেকে ভালো-মন্দ জেনে যাওয়া উচিৎ। সঙ্গে সরিষার তেল আর লবণ রাখতে হবে। কেননা প্রচুর জোঁকের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই দুটি ব্যবস্থাই কার্যকরী।

২. হাতে একটা ছোট বাঁশের টুকরা বা লাঠি সঙ্গে নেওয়া ভালো। এতে পাহাড়ি পথে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা থেকে শুরু করে সাপ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী থেকে নিরাপদ রাখবে।
৩. সঙ্গে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর খাবার স্যালাইন রাখতে ভুলবেন না। জীবাণুনাশক ক্রিম আর তুলা সঙ্গে নেবেন। আর খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। অবশ্যই গাইড নিয়ে যাওয়া উচিত।

Share.

Leave A Reply